চর্যাপদের খণ্ডিত পদগুলো তিব্বতি থেকে প্রাচীন বাংলায় রূপান্তর করেন-
বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:
সঠিক উত্তর হলো: ঘ) সুকুমার সেন।
ব্যাখ্যা:
চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন, যা ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে রচিত বৌদ্ধ সহজিয়া পদাবলী। এই পদগুলো মূলত প্রাচীন বাংলা, মৈথিলি, ওড়িয়া, এবং অসমীয়ার মতো পূর্ব ভারতীয় ভাষার মিশ্রণে রচিত। চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি প্রথম আবিষ্কৃত হয় তিব্বতে, এবং এগুলো তিব্বতি ভাষায় অনুবাদিত বা টীকাকৃত আকারে পাওয়া যায়।
-------------
প্রেক্ষাপট:
• প্রশ্নটি স্পষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করছে যে চর্যাপদের খণ্ডিত পদগুলো (২৩, ২৪, ২৫, এবং ৪৮ নং) তিব্বতি অনুবাদ থেকে প্রাচীন বাংলায় কে রূপান্তর করেছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, (অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়) অনুসারে, এই কাজটি করেছেন সুকুমার সেন। তিনি আনুমানিকভাবে প্রাচীন বাংলায় রূপান্তর করেছেন।
• ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। এই পাণ্ডুলিপিতে ২৩ এর খণ্ডিত, ২৪, ২৫, এবং ৪৮ নং পদগুলো ছিল না।
• অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত অনুসারে,
মূল পুথির চারখানা পাতা লুপ্ত। এই চর্যাটির শেষ চার পঙ্ক্তি ও টীকা, ২৪ নং চর্যার সমস্ত অংশ ও টীকা এবং তার পরের অর্থাৎ ২৫ নং চর্যার মূল ও টীকার প্রথম অংশ বিনষ্ট। তবে এই চর্যাগুলির তিব্বতী অনুবাদ পাওয়া গিয়েছে। ডক্টর প্রবোধচন্দ্র বাগচী সেই অনুবাদ প্রকাশ করেন ১৯৪২ সালে। সেই অনুবাদ অবলম্বনে এই চর্যাগুলির মূল কী ছিল তা অনুমান করে একটি পাঠ-পরিকল্পনা দিয়েছেন ডক্টর হুকুমার সেন তাঁর 'চর্যাীতি পদাবলী' গ্রন্থের ৭৬ থেকে ৭৯ পৃষ্ঠায়।
অপশনগুলোর বিশ্লেষণ:
ক) সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়: ভুল।
তিনি তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে চর্যাপদের ভাষাকে প্রাচীন বাংলা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এর সাহিত্যিক ও ভাষাগত গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেন। তাঁর গবেষণা, বিশেষ করে The Origin and Development of the Bengali Language এবং চর্যাপদের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, এই কাজের জন্য উল্লেখযোগ্য।
খ) হরপ্রসাদ শাস্ত্রী: ভুল।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে চর্যাপদের মূল পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন, কিন্তু তিনি তিব্বতি অনুবাদ আবিষ্কার বা রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিব্বতি অনুবাদ ১৯৫৬ সালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী ও শান্তিভিক্ষু শাস্ত্রীর সম্পাদনায় বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয়।
গ) রাজেন্দ্রলাল মিত্র: ভুল।
রাজেন্দ্রলাল মিত্র (১৮২৪-১৮৯১) চর্যাপদ আবিষ্কারের (১৯০৭) অনেক আগে মারা যান। তিনি সংস্কৃত সাহিত্য ও পুরাতত্ত্ব নিয়ে কাজ করলেও চর্যাপদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।
ঘ) সুকুমার সেন: সঠিক।
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত অনুসারে, সুকুমার সেন প্রবোধচন্দ্র বাগচীর সংস্কৃত অনুবাদের ভিত্তিতে চর্যাপদের খণ্ডিত পদগুলো প্রাচীন বাংলায় রূপান্তর করেন এবং তা প্রকাশ করেন।
--------------------
--------------------
'চর্যাপদ' সম্পর্কিত আরো কিছু তথ্য:
• বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাচর্যবিনিশ্চয় বা চর্যাগীতিকোষ বা চর্যাগীতি বা চর্যাপদ।
• ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ দরবার গ্রন্থাগার থেকে এটি আবিষ্কার করেন।
• চর্যাপদের পদ সংখ্যা: চর্যাপদের পদ সংখ্যা ৫০টি। তবে সুকুমার সেন মনে করেন পদসংখ্যা ৫১টি।
• উদ্ধারকৃত পদের সংখ্যা: চর্যাপদের সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া যায়।
• অনুদ্ধারকৃত/বিলুপ্ত পদের সংখ্যা: সাড়ে ৩টি। প্রাপ্ত সাড়ে ৪৬টি পদের মধ্যে ভুসুকুপা রচিত ২৩নং পদটি খণ্ডিত আকারে পাওয়া গেছে। পদটির ৬টি পদ পাওয়া গেছে কিন্তু বাকি ৪টি পদ পাওয়া যায়নি।
• এছাড়াও চর্যাপদের ২৪নং (কাহ্নপা রচিত), ২৫নং (তন্ত্রীপা রচিত) এবং ৪৮নং (কুক্কুরীপা রচিত) পদগুলো পাওয়া যায়নি।
• চর্যাপদ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন কীর্তিচন্দ্র।
• ১৯৩৮ সালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যাপদের তিব্বতি ভাষার অনুবাদ আবিষ্কার করেন।
• সংস্কৃত ভাষায় মুনিদত্ত চর্যাপদের ব্যাখ্যা করেন। তিনি ১১নং পদের ব্যাখ্যা করেননি।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত - অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়; চর্যাগীতি_পরিক্রমা- ড. নির্মল দাশ; বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম; বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- সুকুমার সেন, Buddhist Mystic Songs- মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এবং বাংলাপিডিয়া।